আদমদীঘিতে অনিয়মের ইস্যুতে খাদ্যবান্ধব বাতিল ডিলারকে পুনর্বহালের রাজনৈতিক চাপ-
আদমদীঘিতে অনিয়মের ইস্যুতে খাদ্যবান্ধব বাতিল ডিলারকে পুনর্বহালের রাজনৈতিক চাপ-
আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি:
বগুড়ার আদমদীঘিতে অনিয়মের অভিযোগে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির এক ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। গত ১২ মার্চ উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটির সর্বসম্মত সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অভিযোগের মুখে পড়া ডিলার মাসুদ রানা সান্তাহার পৌর শ্রমিকদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, তার বিরুদ্ধে উপকারভোগীদের চালের পরিবর্তে নগদ অর্থ প্রদান, গোপনে চাল বিক্রি এবং মজুদে ঘাটতিসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
উপজেলা প্রশাসনের সরেজমিন পরিদর্শনে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরই তার লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তবে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের পর থেকেই তিনি পুনর্বহালের জন্য রাজনৈতিক জোরালো তকবির ও প্রশাসনের ওপর কঠোর চাপ সৃষ্টি করছেন। এতে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে প্রশাসন। এদিকে অনুসন্ধানে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও গত সোমবার দুপুরে ক্ষমতাধর ওই ডিলার মাসুদ রানার তত্ত্বাবধানে পুনরায় চাল বিতরণের কার্যক্রম চালু রয়েছে, যা জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
জানা যায়, উপজেলার ছাতিয়ানগ্রাম পূর্ব ঢাকা রোড এলাকায় প্রায় এক বছর আগে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলারশিপ নেয় মাসুদ রানা। শুরুতে তিনি নিয়ম অনুযায়ী সুবিধাভোগীদের মাঝে নির্ধারিত কার্ডের মাধ্যমে প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে ৩০ কেজি চাল বিতরণ করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। প্রথম অভিযোগটি ওঠে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন সুবিধাভোগীকে চাল দেওয়ার পরিবর্তে তাদের হাতে নগদ টাকা তুলে দেওয়া হয়, যা কর্মসূচির নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ভুক্তভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ লক্ষ্য করা যায়। বিষয়টি উপজেলা খাদ্য দপ্তরের নজরে এলে প্রথমবারের মতো ডিলার মাসুদ রানাকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়। তবে সতর্কবার্তার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত ৯ মার্চ পুনরায় অভিযোগ পাওয়ার পর প্রশাসন সরেজমিনে গুদাম পরিদর্শন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পায়।
সেখানে ২৫ জন ভোক্তার জন্য বরাদ্দ ৭৫০ কেজি চালের ঘাটতি পাওয়া যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চাল অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নীতিমালা গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে নিশ্চিত হয় প্রশাসন। ঘটনার প্রেক্ষিতে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটি গত ১২ মার্চ সর্বসম্মতিক্রমে লিখিত সিদ্ধান্তে মাসুদ রানার ডিলার লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় এবং তা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও পুনর্বহালের জন্য প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিকভাবে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে মাসুদ রানার বিরুদ্ধে। তিনি স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে প্রশাসনের ওপর ব্যাপক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন।
এদিকে তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা দায়ের না হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অথচ কয়েক মাস আগেও অনিয়মের দায়ে একাধিক ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে, যার আসামীরা আত্মগোপনে রয়েছেন। এর আগেও মাসুদ রানার বিরুদ্ধে বিতর্ক রয়েছে। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর হাফিজুর রহমান মিন্টু নামের এক ব্যবসায়ীর করা চাঁদাবাজির লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেন জেলা শ্রমিকদল। তবে সম্প্রতি এক সংসদ সদস্যের সুপারিশে সেই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তাকে পুনরায় দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়, যা বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
এ বিষয়ে মাসুদ রানা জানান, তার ডিলারশিপ বাতিল করা হয়নি, বরং সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি রিসিভ করেনি।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স